প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) হলো সেই অর্থ যা প্রবাসে কর্মরত ব্যক্তিরা তাদের নিজ দেশে পরিবার বা আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে থাকেন। এটি অনেক উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইন, মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর জন্য।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যান এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান।
রেমিট্যান্স শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কল্যাণে ব্যবহৃত হয় না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এটি দেশের বিনিয়োগ, ভোগব্যয় ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের গুরুত্ব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি।
তবে, রেমিট্যান্সের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা, রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে উচ্চ ফি, অনিয়ন্ত্রিত শ্রম অভিবাসন এবং টেকসই বিনিয়োগের অভাবের কারণে অনেক সময় এর পুরো সুবিধা ভোগ করা সম্ভব হয় না।
এই ব্লগে আমরা প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো, যা আমাদের অর্থনীতি ও সমাজে কীভাবে প্রভাব ফেলে এবং ভবিষ্যতে এর আরও কার্যকর ব্যবহারের উপায় কী হতে পারে।
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) এর পরিমাণ ও পরিসংখ্যান
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের প্রবাহ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শুধু ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও ব্যয়ের জন্য ব্যবহৃত হয় না, বরং অনেক দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্সের প্রবাহ
বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্সের প্রবাহ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় সহায়ক শক্তি।
বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ নিজ দেশে পাঠিয়ে থাকেন, যা স্থানীয় অর্থনীতির চাহিদা মেটায় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশই এই অর্থের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যান এবং সেখান থেকে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠান।
- ২০২৩ সালে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ: প্রায় ২২-২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান: বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৬-৭%
- প্রবাসীদের সংখ্যা: আনুমানিক ১ কোটি বাংলাদেশি বর্তমানে বিদেশে কর্মরত
প্রধান দেশসমূহ যেখান থেকে রেমিট্যান্স আসে
বাংলাদেশে প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের প্রধান উৎস দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সৌদি আরব – সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)
- যুক্তরাষ্ট্র
- যুক্তরাজ্য
- কুয়েত
- মালয়েশিয়া
- কাতার
- ওমান
- ইতালি
- সিঙ্গাপুর
এই দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিরা প্রতি বছর লক্ষ কোটি টাকা দেশে পাঠান, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের ধারা ও পরিবর্তন
- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা অস্থির হয়েছে।
- কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক প্রবাসী কাজ হারানোর ফলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়।
- সরকারের রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও বিভিন্ন নীতিমালার কারণে ২০২৩ সালে আবারও রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে, এটি টেকসই করতে হলে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, নিরাপদ অভিবাসন এবং রেমিট্যান্স প্রেরণের সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের অর্থনীতিতে ভূমিকা
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ (রেমিট্যান্স) বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত খরচের জন্য ব্যবহৃত হয় না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের বিভিন্ন প্রভাব আলোচনা করা হলো—
১. জিডিপিতে অবদান
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রেমিট্যান্স থেকে আসে। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৬-৭% রেমিট্যান্স থেকে এসেছে।
- এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ নিশ্চিত করে।
২. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে আমদানি খাতে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
- এটি মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে, যা দেশে বিনিয়োগ ও আমদানি-রপ্তানির জন্য ইতিবাচক।
৩. বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে প্রভাব
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কেবল পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত করে না, বরং এটি দেশে নতুন ব্যবসা ও শিল্প খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে।
- অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে এসে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, যা কর্মসংস্থান তৈরি করে।
- ছোট ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতের বিকাশে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- রেমিট্যান্স অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা হলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
৪. দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা
রেমিট্যান্স দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। এটি দারিদ্র্য হ্রাসে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
- পরিবারগুলোর মাসিক আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
- শিক্ষার ব্যয় বহন করা সহজ হয়, ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ে।
- গ্রামীণ অঞ্চলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার ফলে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা বিকাশ লাভ করে।
৫. ভোগব্যয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি
রেমিট্যান্সের ফলে মানুষের হাতে বেশি অর্থ আসে, যা ভোগব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙা থাকে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
- স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা লাভবান হন।
৬. অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা।
সরকার রেমিট্যান্সের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।
- নতুন রাস্তা, ব্রিজ, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অর্থায়ন করা হয়।
- টেকসই উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে রেমিট্যান্স উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের সমাজ ও পরিবারের ওপর প্রভাব
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ শুধু দেশের অর্থনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না, বরং এটি পরিবার ও সমাজের জীবনযাত্রার মানে এক বড় পরিবর্তন আনে। এই অর্থের মাধ্যমে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত উন্নতি হয়, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ঘটে।
১. পরিবারে জীবনমানের উন্নতি
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের সবচেয়ে বড় সুবিধা পরিবারের সদস্যদের জীবনমানের উন্নতি।
- পরিবারের সদস্যরা নতুন পণ্য, সেবা এবং সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারেন, যা তাদের জীবনের মান বাড়ায়।
- অনেক পরিবার প্রবাসী সদস্যদের পাঠানো অর্থে বাড়ি তৈরি করেন, নতুন গাড়ি কেনেন, এবং অন্যান্য দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করেন।
- শহর বা গ্রামের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়, যেখানে বাড়ির অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের ওপর চাপ কমে।
২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের মাধ্যমে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
- প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পড়াশোনা করার সুযোগ দেন, যা তাদের পেশাগত জীবনকে উন্নত করে।
- চিকিৎসা সেবা, বিশেষ করে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও অনেক সময় এই অর্থের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
- স্বাস্থ্য খাতে ভালো সেবা গ্রহণের ফলে একদিকে যেমন মানুষ সুস্থ থাকে, তেমনি অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমে।
৩. সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ সামাজিক বৈষম্যও সৃষ্টি করতে পারে।
- যেসব পরিবার প্রবাসী সদস্যদের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের সুবিধা পায়, তারা অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্যদের থেকে সামাজিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠে, যার ফলে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
- পরিবারে প্রবাসী সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের জন্য অধিক সুবিধা বা সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হলেও, যেসব পরিবারে প্রবাসী সদস্য নেই, তাদের মাঝে দারিদ্র্য বাড়তে পারে।
- সামাজিক শ্রেণীভেদ এবং ব্যবধান আরও দৃঢ় হতে পারে, যার ফলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৪. যুবক-যুবতীদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোগের উন্নয়ন
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা তাদের উদ্যোক্তা মনোভাব ও ক্যারিয়ার গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
- অনেক যুবক ছোট ব্যবসা বা স্টার্টআপ চালানোর জন্য প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পায়, যা তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
- পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির ফলে যুব সমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়।
প্রবাসীদের চ্যালেঞ্জ ও সমস্যাগুলো
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের সুবিধার পাশাপাশি, প্রবাসীদের কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা রয়েছে, যা তাদের জীবনে অস্থিরতা এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
১. কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
প্রবাসীরা অনেক সময় চাকরি হারানোর ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, বিশেষ করে বিশ্বের অনেক দেশেই শ্রম বাজারে সংকট রয়েছে।
- বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা বা মহামারির কারণে অনেক প্রবাসী তাদের কাজ হারিয়েছেন।
- কর্মসংস্থানের অস্থিরতা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে দেয়, যার ফলে দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও কমে যায়।
২. বেতন বৈষম্য ও প্রতারণা
অনেক প্রবাসী ন্যায্য বেতন পান না, এবং তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার শিকার হতে হয়।
- কিছু ক্ষেত্রে, কনট্রাক্ট বা কাজের শর্তাবলী অমান্য করা হয়, যার ফলে প্রবাসী শ্রমিকেরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হন।
- এছাড়া, অনেক সময় মধ্যস্থতাকারী বা দালালরা প্রবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নিয়ে প্রতারণা করে থাকে।
৩. অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতা
অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের অনেক সময় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
- ভিসা সমস্যার কারণে অনেক সময় প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন বা পুনরায় কাজে যোগ দিতে পারেন না।
- এছাড়া, বিদেশে অবস্থানকালীন আইনগত জটিলতা, যেমন: শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা না পাওয়া, দেশে ফিরে আসার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব ইত্যাদি সমস্যাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারের উদ্যোগ ও নীতিমালা
বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী-প্রেরিত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
১. রেমিট্যান্স প্রণোদনা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সরকার বিভিন্ন রকম প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে তারা সহজে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে।
- সরকারের সাশ্রয়ী রেমিট্যান্স প্রেরণ পদ্ধতি গ্রহণ ও উৎসাহ প্রদান কার্যক্রমে সাহায্য করছে।
- দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণের জন্য কমিশন ফি কমিয়ে আনা হয়েছে।
২. নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা
সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিমালার উন্নয়ন করছে।
- প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন।
- বিদেশে কাজের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আইনগত কাঠামো আরও উন্নত করার চেষ্টা চলছে।
৩. বিনিয়োগে উৎসাহিত করা
সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশি উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করছে।
- প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা এবং সহজ শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
- দেশে ফিরে এসে প্রবাসীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করলে দেশীয় শিল্প ও ব্যবসা খাতের বিকাশ ঘটবে।
এই উদ্যোগগুলো যদি কার্যকরীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ আরও বেশি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, তবে ভবিষ্যতে এটি আরও কার্যকরীভাবে ব্যবহৃত হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে। এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে এবং এর ব্যবহারের সর্বাধিক সুবিধা নিতে সহায়তা করবে।
১. প্রযুক্তির মাধ্যমে রেমিট্যান্স ব্যবস্থার সহজীকরণ
আজকের ডিজিটাল যুগে রেমিট্যান্স প্রেরণ সহজতর করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা সহজেই রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, যার ফলে ট্রান্সফারের খরচ কমবে এবং দ্রুততার সঙ্গে অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে।
- ব্লকচেইন প্রযুক্তি, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে পারে, যা প্রবাসীদের জন্য আরও সুবিধাজনক হবে।
- প্রযুক্তির ব্যবহারে রেমিট্যান্স প্রেরণের জন্য রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যাতে প্রতারণা বা ত্রুটি কমানো যায়।
২. দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা যে দেশে যান, সেখানে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই দক্ষ জনশক্তির রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন।
- আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে তাদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
- সরকারকে প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কর্মশালা চালু করতে হবে।
- বিশ্বব্যাপী শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলো আপডেট করা উচিত, যাতে কর্মীরা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেন।
৩. বিনিয়োগের নতুন খাত তৈরি করা
রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে পাঠানো অর্থ যদি সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা হয়, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন দ্রুততর হতে পারে।
- সরকারকে বিনিয়োগের জন্য নতুন খাত তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যেমন: প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প।
- প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তারা তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবেন।
- দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বৃহৎ বিনিয়োগ প্রণোদনা চালু করা গেলে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে অর্থ আসা আরও গতি পাবে।
৪. রেমিট্যান্সের সাশ্রয়ী ব্যবহার
যেহেতু অনেক পরিবার রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা মেটান, সেক্ষেত্রে এই অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
- প্রবাসীরা তাদের পাঠানো অর্থ শুধু ভোগের জন্য না, বরং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করতে উৎসাহিত হতে পারেন।
- সরকার ও ব্যাংকগুলোকে সঞ্চয়ী হিসাব খোলার সুবিধা এবং বিনিয়োগের বিভিন্ন পথ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
- প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সঞ্চয় বা পেনশন স্কিম চালু করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
উপসংহার
প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে একটি শক্তিশালী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এটি শুধু দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে না, বরং অনেক পরিবারকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে, এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে হলে সরকারের উদ্যোগ, প্রযুক্তির সহায়তা এবং কার্যকরী নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি। প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করলে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
অতএব, প্রবাসী-প্রেরিত অর্থ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নয়, বরং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য একটি বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে, যদি এটি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।
আরও পড়ুনঃ ইসলামী ব্যাংক সিঙ্গাপুর ডলার রেট টুডে
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন