আজকের দিনে মোবাইল ফোন ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে এটি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোনের নাম কি ছিল? কবে এবং কে এটি আবিষ্কার করেছিলেন? চলুন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করি।
বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোনের নাম
বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোনের নাম ছিল Motorola DynaTAC 8000X। ১৯৮৩ সালে এটি বাজারে আসে এবং এটি বানিয়েছিল আমেরিকার বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মটোরোলা (Motorola)। এই ফোনটি ছিল আকারে অনেক বড়, প্রায় এক কেজি ওজনের এবং চার্জ দিয়ে মাত্র ৩০ মিনিট ব্যবহার করা যেত।
মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা, প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের একটি চমকপ্রদ ইতিহাস। মোবাইল ফোনের আবিষ্কারক হিসেবে সর্বাধিক স্বীকৃত নাম হল মার্টিন কুপার, যিনি ১৯৭৩ সালে মটোরোলা কোম্পানির একজন প্রকৌশলী হিসেবে প্রথম কার্যকর মোবাইল ফোনের সফল পরীক্ষা চালান।
এই মোবাইল ফোনটি ছিল Motorola DynaTAC 8000X, যা দেখতে ছিল অনেকটাই বড়, ওজনে ভারী এবং সীমিত কার্যক্ষমতার। এটি ব্যবহার করতে হলে একটি বিশাল ব্যাটারি দরকার হতো, যা খুব বেশি সময় চার্জ ধরে রাখতে পারত না।
মার্টিন কুপারের এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের পেছনে মূল অনুপ্রেরণা ছিল মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন ও সহজ করা। সে সময়ের যোগাযোগ প্রযুক্তি মূলত তারযুক্ত টেলিফোনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা ব্যবহারকারীদের স্থানে আবদ্ধ করে রাখত। কুপার চেয়েছিলেন এমন একটি ডিভাইস তৈরি করতে, যা মানুষকে যেকোনো জায়গা থেকে যোগাযোগের স্বাধীনতা দেবে।
তার এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল, যখন তিনি নিউইয়র্ক শহরের একটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রথম মোবাইল কল করেন। এই ঐতিহাসিক ফোনকলটি করা হয়েছিল AT&T-এর বেল ল্যাবরেটরির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৌশলী জোয়েল এস. এঙ্গেলকে, যিনি সে সময় মোবাইল যোগাযোগ প্রযুক্তিতে মটোরোলার অন্যতম প্রতিযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে মোবাইল ফোন শুধু গবেষণা ও উন্নয়ন সীমিত ছিল এবং এটি কেবলমাত্র সরকারি ও উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোর ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ছিল। ১৯৮৩ সালে Motorola DynaTAC 8000X বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে, যা ছিল বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল ফোন। তবে এই ফোনের দাম ছিল অত্যন্ত বেশি, প্রায় ৪,০০০ ডলার, এবং এটি চার্জ করার পরও মাত্র ৩০ মিনিট ব্যবহার করা যেত।
এরপর মোবাইল প্রযুক্তির অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৯০-এর দশকে মোবাইল ফোন আরও ছোট, হালকা ও সাশ্রয়ী মূল্যের হতে শুরু করে। এর পাশাপাশি নোকিয়া, সনি এরিকসন, স্যামসাং, মটোরোলা, ব্ল্যাকবেরি প্রভৃতি কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন নিয়ে বাজারে আসে। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন শুধু কথা বলা ও বার্তা পাঠানোর সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে ক্যামেরা, ইন্টারনেট, অ্যাপ্লিকেশন ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করতে থাকে।
২০০৭ সালে অ্যাপল প্রথম আইফোন উন্মোচন করে, যা মোবাইল প্রযুক্তির এক নতুন যুগের সূচনা করে। এরপর অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের আবির্ভাবের মাধ্যমে স্মার্টফোন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে মোবাইল ফোন কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন এখন ক্যামেরা, জিপিএস, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, অনলাইন কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
মোবাইল ফোনের এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি চমৎকার উদাহরণ। মার্টিন কুপার এবং তার দল যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা আজ বাস্তব হয়ে সারা বিশ্বের মানুষের জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে।
মোবাইল ফোন কে আবিষ্কার করেন এবং কত সালে?
মোবাইল ফোনের আবিষ্কারক হলেন মার্টিন কুপার (Martin Cooper), যিনি মটোরোলার একজন প্রকৌশলী ছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল তিনি প্রথমবারের মতো একটি মোবাইল ফোন থেকে কল করেন। এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক ডিভাইস, এবং তিনি কল করেছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান AT&T Bell Labs-এর একজন গবেষককে। এটি ছিল আধুনিক মোবাইল যোগাযোগ প্রযুক্তির সূচনা।
মার্টিন কুপার প্রথম মোবাইল কল করেছিলেন বেল ল্যাবসের এক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৌশলী জোয়েল এস. এঙ্গেলকে। তবে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য মোবাইল ফোন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে।
প্রথম দিকের মোবাইল ফোনগুলো অনেক বড়, ব্যাটারির স্থায়িত্ব কম এবং দাম অনেক বেশি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মোবাইল ফোন ছোট, হালকা ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের সূচনা
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। এ সময় দেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর হিসেবে সিটিসেল (CityCell) কার্যক্রম শুরু করে। এটি ছিল একটি এমএনও (Mobile Network Operator) কোম্পানি, যা সিডিএমএ (CDMA) প্রযুক্তির মোবাইল সেবা প্রদান করত। সিটিসেল বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করার পথ তৈরি করলেও, শুরুতে এর ব্যবহার সীমিত ছিল, কারণ ফোনের দাম ছিল অত্যন্ত বেশি এবং এটি শুধুমাত্র উচ্চবিত্তদের নাগালের মধ্যে ছিল।
এরপর ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে গ্রামীণফোন (Grameenphone), একটেল (বর্তমানে রবি), ও শেখ টেলিকম (বর্তমানে বাংলালিংক) মোবাইল সেবা চালু করে। বিশেষ করে গ্রামীণফোন ব্যাপক আকারে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে এবং তুলনামূলক কম খরচে সেবা প্রদান শুরু করে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়তে থাকে।
২০০০-এর দশকে মোবাইল প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যখন জিএসএম (GSM) প্রযুক্তি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে করে সিম কার্ডভিত্তিক মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হয়, যা মানুষকে আরও সহজে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মোবাইল সেবা গ্রহণের সুযোগ দেয়। এরপর ২০০৫ সালে বাংলালিংক বাজারে আসে এবং "দেশের কথা" ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মোবাইল ফোনকে আরও বেশি মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেয়।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে ৩জি সেবা চালু হয় এবং এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।
এরপর ২০১৮ সালে ৪জি সেবা চালু হয়, যা আরও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করে এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ৫জি প্রযুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
আজকের বাংলাদেশে মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতি, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, এবং শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মোবাইল প্রযুক্তির এই ক্রমবিকাশ বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে।
বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন কোম্পানির নাম
বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন তৈরির কৃতিত্ব পায় মটোরোলা (Motorola)। এটি ছিল একটি মার্কিন টেলিকম কোম্পানি, যা ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পর মটোরোলা একের পর এক নতুন প্রযুক্তির ফোন বাজারে নিয়ে আসে এবং মোবাইল কমিউনিকেশন খাতে বিপ্লব ঘটায়।
উপসংহার
মোবাইল ফোনের আবিষ্কার আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। এটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। আজ আমরা ছোট ও শক্তিশালী স্মার্টফোন ব্যবহার করছি, যা শুধু কথা বলার জন্য নয়, বরং ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ছবি তোলা, গেম খেলা এবং অসংখ্য কাজের জন্য ব্যবহার করা যায়। এক সময়ের ভারী মোবাইল ফোন এখন আমাদের পকেটে সহজেই বহনযোগ্য হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে মোবাইল প্রযুক্তি আরও কী চমক নিয়ে আসবে, তা দেখার জন্য আমরা উদগ্রীব।
আরও পড়ুনঃ ভিআইপি ফেসবুক একাউন্টের জন্য সেরা বায়ো লেখার কৌশল
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন